যেমন ছিল কসকো সাবানের গন্ধমাখা ঈদের দিনগুলো

আশির দশকে চট্টগ্রাম নিউমার্কেট নিয়ে রীতিমতো গর্ব করতাম আমরা। দেশে এত সুন্দর বিপণিবিতান আর কোথাও নেই। ঢাকা থেকেও যারা আসত, একবার কথাটা তাদের মুখ থেকেই বের করিয়ে নিতাম আমরা। সে সময় ঈদের কেনাকাটায় এত ভিড় ছিল না। আর দোকানে দোকানে ঘোরাফেরা করেও জামা-জুতা পছন্দের বালাই ছিল না তেমন। আমাদের ছয় ভাই-বোনের বিশাল টিম, আম্মা সামনে আর আমরা পেছনে। রমজানের মাঝামাঝি সময়ে আমরা নিউমার্কেটে গিয়ে কেউ বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঢুকেছি টেইলারের দোকানে আর কেউ জুতার দোকানে। আম্মা পাবনা এম্পোরিয়াম নামের একটা শাড়ির দোকানে বসে একে–ওকে এদোকানে–ওদোকানে পাঠাতেন। মাঝেমধ্যে আম্মাও থাকতেন সঙ্গে।

সুইস বয়েলের শার্ট, টেরিলিন, টুইড কিংবা কর্ডের প্যান্ট আর হাই হিল স্যান্ডেলের চল ছিল তখন। তখনো জিনস আসেনি। জুতা বলতে চামড়ার অক্সফোর্ড শু, হকি শু আর হিলওয়ালা স্যান্ডেল। অনেক পরে কোলাপুরি স্যান্ডেলের চল এল। কাপড় যেদিন সেলাই হয়ে আসত, সেদিন একটা বিশেষ দিন আমাদের। নতুন জামা খাটের জাজিম কিংবা বালিশের নিচে রেখে একটু পরপর না দেখলে যেন নির্ঘাত মারা যাব। ঈদের দিন নামাজের আগে সুগন্ধি সাবান ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। সাবান বলতে কসকোই ছিল সবচেয়ে ভালো। খুব যত্নে সেটা গায়ে মাখতে মাখতে মনে হতো, জীবন আসলেই সার্থক হয়ে যাচ্ছে। এমন গন্ধের জন্যই যেন বেঁচে আছি।

১৯৮০-৮১ সালে আমার বয়স সাত-আট হবে। পাহাড়তলীর রেলওয়ের কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা। সে সময় পাহাড়তলী একটা বিরান-বিচ্ছিন্ন এলাকা। বিকেলেই শেয়াল বের হয়ে যেত রাস্তায়। বেবি ট্যাক্সি, মুড়ির টিন নামের কাঠের বডির বাস আর রিকশাই ছিল প্রধান যানবাহন। রিকশায় কিংবা ভটভট শব্দ করা অটোরিকশায় আমরা বেড়াতে যেতাম আত্মীয়ের বাড়ি। তার আগে ঈদের দিন সকালে বাসায় তৈরি নানা ধরনের সেমাই, চুটকি পিঠা খাওয়া হতো। আর খালা কিংবা ফুফুর বাড়িতে দুপুরে ঝাল মাংস আর পোলাও। এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যা নামতেই আমরা টেলিভিশনের সামনে বসে পড়তাম। ঈদের সিনেমা, তারপর ‘আনন্দ মেলা’ দেখে শেষ হতো আমাদের ঈদ।

আমাদের এলাকায় নেভি সিনেমা হলে টিকিট ব্ল্যাক করতেন দুলাল নামের একজন। তিনিই একবার খবর দিলেন, ঈদে এবার যে ‘বই’ এসেছে, সেটা সুপারহিট।। তখন সিনেমাকে আমরা বই–ই বলতাম। এই বইয়ের নাম ‘ছুটির ঘণ্টা’। দুলালের মা রেলওয়ের চাকরির সূত্রে আমাদের বাসায় আসতেন। দুলালও আসতেন সঙ্গে। তিনি টিকিট ম্যানেজ করে দেবেন বলে আশা দিলেন। আমরাও আম্মার কাছে বায়না ধরলাম, ‘ছুটির ঘণ্টা’ দেখতে দিতেই হবে। ঈদের ছুটিতে ভাই-বোন আর প্রতিবেশীর আন্ডাবাচ্চা মিলে আমরা জনাদশেক গেলাম ‘ছুটির ঘণ্টা’ দেখতে। এমন সিনেমাও হয়। খোকা (মাস্টার সুমন) আর আব্বাসের (রাজ্জাক) জন্য কেঁদে কেঁদে মুখ ফুলে গেছে আমার। আহা, সেই ঈদও নেই, সেই সিনেমাও নেই আর।

ঈদের দিন ফুফু, খালাদের কাছ থেকে এক টাকা ঈদের সালামি পেতাম। তখন এক টাকা অনেক দামি। এক টাকায় দুধমালাই আইসক্রিম, আর ভিউ কার্ড কিনতাম আমরা। আর মাঝেমধ্যে পাড়ার দোকান থেকে গুলতি কেনা হতো। খেলনা বলতে তখন গুলতিরই কদর ছিল আমাদের কাছে।

আশির দশকের ঈদের এই ছবি এখনকার অনেকেই মনে করতে পারবেন। কিন্তু তারও আগে কেমন ছিল ষাটের দশকের ঈদ, এখনকার অনেকের কাছেই তা অজানা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ আবুল মোমেনের জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি এলাকার বিখ্যাত বাড়ি সাহিত্য নিকেতনে। তাঁর বাবা কথাসাহিত্যিক আবুল ফজলের বাড়িটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই আমার যাতায়াত ছিল। মোমেন ভাইয়ের বাসা যেখানে, এর আশপাশেই ক্রিকেটার তামিম ইকবালদের বাড়ি। শহরের পুরোনো বাসিন্দাদের অনেকেই তখন ওই এলাকায় থাকতেন। আবুল মোমেনের কাছ থেকে জানলাম, ষাটের দশকে ঈদের প্রধান জামাত হতো চট্টগ্রামের স্টেডিয়াম মাঠে। সে সময় হাতে তৈরি পিঠা ও সেমাই ছিল ঈদের প্রধান খাবার। আর তাই বেশ কয়েক দিন ধরেই বাড়িতে তার প্রস্তুতি চলত। পোশাক সেলাইয়ের জন্য তাঁরা যেতেন রিয়াজুদ্দিন বাজারে। সেখানে দিল্লি স্টোর, চিটাগাং শু প্লেয়ার—এসব দোকানে বেশ ভিড় হতো। দরজিদের ব্যস্ততা ছিল খুব। রেডিমেড বলে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।

ঈদের দিন দুই–তিন রকমের সেমাই, গুঁড়ি পিঠা, সেমাই তৈরি হতো। ঝাল পদের তেমন চল ছিল না। খুব অভিজাত লোকজনের বাড়িতে কোরমা–পোলাও রান্না হতো। ঈদের দিন ছোটরা বাড়ি বাড়ি যেত ঈদি নিতে। দিন শেষে ঈদি দিয়ে চলত খাওয়াদাওয়া।

আরও একটা কথা জানলাম আবুল মোমেনের কাছ থেকে। চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি বা আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীদের জন্য ‘চানরাত’ ছিল কেনাকাটার নির্ধারিত দিন। ঈদের চাঁদ দেখা গেলে সদলবল তাঁরা বের হতেন কেনাকাটা করতে। এরই ফাঁকে ফাঁকে চলত আড্ডা। সব মিলিয়ে আগেকার ঈদের আনন্দের কোনো তুলনাই হয় না।

Tushar Ghosh | 30.03.2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *